মিশরীয় মিথলজির কিছু স্বল্প পরিচিত দেব-দেবীঃ পর্ব ১

দেবী মাফদেত

Mafdet (মতান্তরে Maftet) হচ্ছেন মিশরীয় পুরাণের প্রথম কোনো বিড়াল গোত্রীয় দেবতা। দেবী মাফদেত মূলত ন্যায়বিচার এবং অপরাধ অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের দেবী। মিশরীয় পুরাণে দেবী মাফদেত কর্তৃক অপরাধীদের দেয়া এই শাস্তি বেশিরভাগ সময়েই মৃত্যুদণ্ড হতে দেখা যায়। দেবী মাফদেতকে কখনো বিড়ালের চেহারায়, কখনো চিতাবাঘের চেহারায়, কখনো সিংহের কিংবা কখনো কখনো বেজির চেহারায়ও কল্পনা করা হয়। কিন্তু প্রতিটা ক্ষেত্রেই চেহারাটা হয় বিড়াল গোত্রীয় কোনো প্রাণীর, আর বাকি শরীর থাকে মানুষের মতো।

বিছা এবং সাপদের মতো বিষাক্ত প্রাণীদের যেহেতু বেশিরভাগ সময়ে এই সব বিড়াল গোত্রীয় প্রাণীরাই বধ করে থাকে, তাই মিশরীয়রাও দেবী মাফদেতকে কল্পনা করেছিলো এমন বিড়াল গোত্রীয় প্রাণীদের চেহারায়। তাদের বিশ্বাস ছিলো, এই দেবী কঠোর শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে অন্যায়কারীর বিষাক্ত ছোবল থেকে নিরীহদের উদ্ধার করবেন।

1

মিশরীয় পুরাণে উল্লিখিত আছে, পাতাল রাজ্যের বিচার সভায় ফারাওদের সমস্ত শত্রুদের বিচার করা হয় এবং শাস্তি দেয়া হয় দেবী মাফদেত কর্তৃক। ফারাওদের বিরুদ্ধাচরণ করলেই মাফদেত নিজের ধারালো নখর দিয়ে সেই অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন পাতালপুরীর সেই বিচার সভায়।

দেবী মাফদেতের আরেকটা দায়িত্ব ছিলো ফারাওদের সুরক্ষা দেয়া। এজন্যে মিশরীয় ফারাওদের প্রাসাদের বিশেষ কক্ষে দেবী মাফদেতের মূর্তি স্থাপন করা হতো। ফারাওদের সমাধিস্থলেও ফারাওকে বিষাক্ত প্রাণী (সাপ, বিছা) হতে নিরাপদে রাখার জন্যে দেবী মাফদেতের মূর্তি স্থাপন করা হতো। প্রকৃতপক্ষে, মিশরীয় পুরাণের প্রথম যুগে দেবী মাফদেত ছিলেন সাপ এবং বিছার কামড় হতে সুরক্ষা প্রদানের দেবীও। বিষাক্ত প্রাণীর কামড় থেকে বাঁচতেও অনেকে দেবী মাফদেতের শরণাপন্ন হতো। দেবতা ‘রা’-এর রক্ষাকর্তাও ছিলেন দেবী মাফদেত। কারণ, ‘রা’-এর বিষাক্ত প্রাণীদের কামড়ের বিরুদ্ধে দুর্বলতা ছিলো।

দেবী মাফদেতের প্রতীক হলো রাজদণ্ড এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ধারালো ছুরি, কাস্তে কিংবা কখনো কখনো হাতের নখর। পরবর্তী যুগের মিশরীয় পুরাণগুলোতে দেবী মাফদেতকে মূলত জল্লাদ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিলো। সেখানে দেখানো হয়েছিলো, দেবী মাফদেত কীভাবে তার ধারালো নখর দিয়ে অপরাধীদের হৃদপিণ্ড বের করে এনে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতেন। পরে সেই হৃদপিণ্ড উপস্থিত করতেন ফারাওয়ের পায়ের নিকট। এসব কারণেই দেবী মাফদেতকে ডাকা হয় ‘রাজার পক্ষে প্রতিশোধ গ্রহণকারী দেবতা (Avenger of the King)’ হিসেবে।

দেবী মেনহেত

2

মিশরীয় পুরাণের সবখানে অবশ্য মেনহেতের নাম পাওয়া যায় না। Nubian মিথলজিতে এই দেবীর নাম উল্লেখ করা আছে। Nubia ছিলো নীল নদ ঘেঁষে গড়ে উঠা এক অঞ্চল (বর্তমান সুদানের উত্তর পাশ এবং মিশরের দক্ষিণ পাশ নিয়ে গঠিত)। এখানেই খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে গড়ে উঠেছিলো উত্তর আফ্রিকার সর্বাধিক প্রাচীন সভ্যতাগুলোর একটা। তাদের লিখিত পুঁথিতেই পাওয়া যায় মেনহেতের নাম।

যুদ্ধের অন্যান্য দেবদেবীর মতো মেনহেতকেও বিভিন্ন কাহিনীতে দেখা যেতো সম্মুখ হতে বাহিনীকে নির্দেশনা দিতে এবং নিজে মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমে শত্রুদের কচুকাটা করতে। তার পছন্দের অস্ত্র ছিলো আগুনের তীর।

এই দেবীর মাথার মুকুট ছিলো সূর্য। তবে কখনো কখনো দেখা যেতো সেই সূর্য হতে সামনের দিকে বিষাক্ত গোখরো সাপ বেরিয়ে আছে। মিশরীয় ঐতিহ্যে খুব কম দেবদেবীর মাথার মুকুটেই এই ফণা তোলা গোখরো সাপটা আছে। যাদের মাথার মুকুটে এটা আছে, তাদের অত্যন্ত অভিজাত হিসেবে গণ্য করা হয়। মেনহেতও সেই স্বল্প সংখ্যক দেবীর একজন।

মিশরের উত্তরাংশে মেনহেতকে দেবতা খানুম-এর (মতান্তরেখেনমু’, ভেড়ার মাথাবিশিষ্ট দেবতা, উর্বরতার প্রতীক) রক্ষিতা হিসেবে উপাসনা করা হতো। এছাড়াও পরবর্তীতে ‘আনহুর’ নামক যুদ্ধ দেবতার সঙ্গী হিসেবেও কল্পনা করা হয়েছিলো তাকে।

মিশরের অধিকাংশ বিড়াল গোত্রীয় প্রাণীর চেহারাবিশিষ্ট দেবদেবীকে পাতালপুরীর কোনো না কোনো নরকের রক্ষক এবং শাসনকর্তা হিসেবে দেখা যায়। একইসাথে ফারাওদের রক্ষার দায়িত্বও বর্তায় এই ধরণের দেবদেবীর ঘাড়ে। মেনহেতও তার ব্যতিক্রম নন। তার মূর্তি পাওয়া গিয়েছিলো তুতেনখামুনের সমাধিতে।

দেবতা ইমহোটেপ

Imhotep (কখনো কখনো Immutef নামেও ডাকা হয়) হচ্ছেন সেই সব স্বল্প সংখ্যক মিশরীয় দেবদেবীর মাঝে একজন, যিনি বাস্তবেই পৃথিবীতে জীবনযাপন করে গেছেন। ফারাওদের ছাড়া আর যে গুটিকয় রক্তমাংসের মানুষকে মিশরীয়রা ঈশ্বরের মর্যাদা দিয়ে উপাসনা করতো, ‘ইমহোটেপ’ হচ্ছেন তাদের একজন। তাকে স্থাপত্যবিদ্যা এবং বিজ্ঞান চর্চার দেবতা হিসেবে উপাসনা করা হতো সমগ্র মিশরে। তার অনুসারীরা তাকে মিশরীয় পুরাণের আরেক ঈশ্বর Ptah-এর সন্তান বলে বিশ্বাস করতো। পুরাণে বর্ণিত আছে, এই Ptah-ই হচ্ছেন সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা।

3

ইমহোটেপ’ ছিলেন মূলত একজন মিশরীয় প্রকৌশলী এবং স্থপতি। একইসাথে তিনি ছিলেন লেখক, ডাক্তার এবং জ্যোতির্বিদ। প্রাচীন মিশরে স্থাপত্যবিদ্যার জনক ধরা হয় তাকেই। ২৬৫০-২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সময়কালটাতে তিনি পৃথিবীতে বিচরণ করে গেছেন বলে ধারণা করা হয়। তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত মেম্ফিসের নিকটে সাক্কারায় অবস্থিত পিরামিডটার নির্মাণের জন্যে। প্রকৌশলী ইমহোটেপের নকশায় সিঁড়ির ধাপের মতো করে তৈরি এই পিরামিডটাকেই ধরা হয় মানুষের হাতে তৈরি প্রথম কোনো স্থাপত্য, যা আগাগোড়া পুরোটাই পাথরের চাঁই দিয়ে বানানো হয়েছে।

ইমহোটেপের পিতাকে নিয়ে দ্বিমত না থাকলেও তার মাতাকে নিয়ে সংশয় আছে পুরাণের মাঝে। এক পুরাণে লেখা আছে, তিনি ছিলেন ‘খেরেদু-আঁখ (Kheredu-Ankh)’ নামক এক নারীর সন্তান, যিনি মানুষের মতোই মরণশীল। এই বর্ণনা অনুযায়ী, ইমহোটেপ একজন অর্ধঈশ্বর। আবার আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, তার পিতার মতো মাতাও ছিলেন একজন ঈশ্বরী। তার মাতা নাকি আসলে ছিলেন ‘সেখমেত (Sekhmet)’। এই বর্ণনা অনুযায়ী ইমহোটেপকে আবার তাহলে একজন পুরাদস্তুরই ঈশ্বরই বলা চলে।

মিশরীয় পুরাণে তার অনেক অলৌকিক উপায়ে রোগ সারাইয়ের ক্ষমতার বর্ণনা দেয়া আছে। অলৌকিক সব ঔষধ পথ্যের বর্ণনা দিয়ে সেগুলোর জন্যেও কৃতিত্ব দেয়া হয় ইমহোটেপকে। তার এই বিশেষ রূপটা গ্রীসেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। গ্রীসে তাকে তুলনা করা হতো Asclepius-এর সাথে, যিনি গ্রীক পুরাণে ঔষধ পথ্য এবং রোগ সারাইয়ের দেবতা।

ইমহোটেপের মৃত্যুর পর হতেই মূলত তাকে ঈশ্বরের মর্যাদা দিয়ে উপাসনা করা শুরু হয়। তার মৃত্যুর আরও প্রায় দুইশ’ বছর পরে তাকে ঈশ্বরের মর্যাদা দেয়া হয়। পুরো মিশর জুড়ে তাকে ফারাওদের মতোই একজন ঈশ্বর হিসেবে গণনা করে উপাসনা শুরু হয়ে যায়। পণ্ডিতেরা প্যাপিরাসের উপরে কোনো কিছু লিখতে শুরু করার আগে কয়েক ফোঁটা কালি ছিটিয়ে দিতেন ইমহোটেপের স্মরণে। তাদের বিশ্বাস ছিলো, বিজ্ঞান চর্চার দেবতা ইমহোটেপ তাহলে আশীর্বাদ করবেন তাদের এই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় এবং আড়াল হতে সাহায্য করবেন শিক্ষা অর্জনে ও গবেষণায়।

প্রকৌশলী ইমহোটেপ নিজের সমাধি নিজেই নির্মাণ করে গেছেন। কিন্তু সেই সমাধিটা কোথায়, সেটা আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি (সম্ভবত হলিউড অভিনেতা ‘ব্রেন্ডেন ফ্রেজার’ বাদে। ‘দ্যা মামি’ মুভিতে এবং তার পরবর্তী সিকুয়েলে টেকো মাথার যে ভিলেনকে সবাই দেখেছিলেন, সেইই আমাদের আজকের পোস্টের এই ইমহোটেপ)! তবে ধারণা করা হয়, ইমহোটেপ তার সমাধিস্থল গোপনে সাক্কারা অঞ্চলের কোথাও বানিয়েছিলেন, যেখানে পরে তার শেষকৃত্য অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে সম্পন্ন হয়।

লেখকঃ রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্স ভাই

তথ্যসূত্রেঃ

ইমহোটেপঃ

মেনহেতঃ

মাফদেতঃ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s